বুধবার ১১ই ডিসেম্বর অগ্রহায়ণ মাসের শুক্ল পক্ষের মহাপবিত্র মোক্ষদা একাদশী মহাব্রত।এই একাদশীর মাহাত্ম্য সম্পর্কে বিস্তারিত - সনাতনী এক্সপ্রেস

সনাতনী এক্সপ্রেস

"সনাতনী এক্সপ্রেস হিন্দু সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং আধ্যাত্মিকতার সর্বশেষ সংবাদ এবং আপডেটগুলি সরবরাহ করে, আপনাকে সনাতন ধর্মের সারাংশের সাথে সংযুক্ত রাখার ক্ষুদ্র প্রয়াস।"

সদ্য প্রাপ্ত

Home Top Ad

Post Top Ad

Translate

বুধবার ১১ই ডিসেম্বর অগ্রহায়ণ মাসের শুক্ল পক্ষের মহাপবিত্র মোক্ষদা একাদশী মহাব্রত।এই একাদশীর মাহাত্ম্য সম্পর্কে বিস্তারিত



 মোক্ষদা একাদশী হল একাদশী তিথির মধ্যে অন্যতম পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন, যা হিন্দু ধর্মে ভক্তি ও সাধনার জন্য অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করা হয়। এটি অগ্রহায়ণ মাসের শুক্লপক্ষের একাদশীতে উদযাপিত হয়। এই একাদশীকে মোক্ষ লাভের বিশেষ দিন হিসাবে বিবেচনা করা হয়, এবং বিশ্বাস করা হয় যে এই দিনে উপবাস ও ভগবান বিষ্ণুর উপাসনা করলে মোক্ষ বা মুক্তি অর্জন সম্ভব হয়।



    মোক্ষদা একাদশীর মাহাত্ম্য

    মোক্ষদা একাদশীর মাহাত্ম্য মূলত ধর্মশাস্ত্র ও পুরাণে বর্ণিত হয়েছে। ব্রহ্মাণ্ড পুরাণপদ্ম পুরাণে এই একাদশীর বিশেষ উল্লেখ রয়েছে।

    1. মোক্ষ লাভের দিন:
      এই একাদশীতে উপবাস এবং ভগবান শ্রীহরির পূজা করলে জীবনের সমস্ত পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয় এবং আত্মার মুক্তি লাভ হয়। এই কারণে একাদশীর নাম হয়েছে "মোক্ষদা"।

    2. গীতার জ্ঞানের দিবস:
      মোক্ষদা একাদশীর দিনকেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্গীতার জ্ঞান প্রদান করেছিলেন বলে মনে করা হয়। তাই এই একাদশী গীতা জয়ন্তী হিসেবেও পালিত হয়।

    3. ধর্মকথা:
      ব্রহ্মাণ্ড পুরাণে একটি কাহিনি রয়েছে, যেখানে বর্ণিত হয়েছে যে একবার এক রাজার প্রেতলোকগামী পিতাকে মুক্তি দেওয়ার জন্য এই একাদশী পালন করতে বলা হয়। একাদশীর উপবাস ও পূজার মাধ্যমে সেই আত্মা মুক্তি লাভ করে এবং স্বর্গে গমন করে।

    4. বিশেষ ফলপ্রাপ্তি:
      বিশ্বাস করা হয় যে, মোক্ষদা একাদশীতে যারা সৎভাবে উপবাস করেন, তারা পাপমুক্ত হয়ে শ্রীবিষ্ণুর কৃপায় অনন্তকাল ধরে স্বর্গীয় সুখ উপভোগ করেন।



    উপবাসের নিয়ম ও পদ্ধতি

    মোক্ষদা একাদশীর উপবাসে কিছু বিশেষ নিয়ম অনুসরণ করতে হয়:

    1. একাদশীর আগের দিন (দশমী তিথি) থেকে নিষেধ খাবার (মাংস, মাছ, রসুন, পেঁয়াজ) ত্যাগ করতে হয়।
    2. উপবাসে শুধুমাত্র ফল, জল, এবং দুধ গ্রহণ করা হয়। কেউ কেউ কঠোর উপবাস পালন করেন, যা নির্জলা উপবাস নামে পরিচিত।
    3. একাদশীর দিনে ভগবান বিষ্ণুর মন্ত্রজপ, গীতাপাঠ, এবং ভগবান বিষ্ণুর নামকীর্তন করা উচিত।
    4. দ্বাদশী তিথিতে উপবাস ভঙ্গ করতে হয় এবং ব্রাহ্মণ বা দুঃস্থদের দান করা পুণ্যের কাজ বলে বিবেচিত।

    উপাস্য দেবতা

    মোক্ষদা একাদশীর প্রধান উপাস্য দেবতা হলেন ভগবান শ্রীহরি বিষ্ণু। এই দিনে শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম ধারণ করা বিষ্ণুর পূজা করলে পূর্ণফল লাভ হয়।

    মোক্ষদা একাদশীর বিশেষ প্রার্থনা

    ॐ नमो भगवते वासुदेवाय।  
    ॐ विष्णवे नमः।  
    ॐ अच्युताय नमः।  
    ॐ अनंताय नमः।  
    ॐ गोविंदाय नमः।  
    


    নিচে মন্ত্রগুলির বাংলা অর্থ সহ দেওয়া হলো:

    1. ॐ नमो भगवते वासुदेवाय।
      বাংলা অর্থ: আমি ভগবান বাসুদেব (ভগবান বিষ্ণু)-এর প্রতি প্রণাম জানাই।

    2. ॐ विष्णवे नमः।
      বাংলা অর্থ: ভগবান বিষ্ণুকে নমস্কার জানাই।

    3. ॐ अच्युताय नमः।
      বাংলা অর্থ: অচ্যুত (যিনি কখনো পতিত হন না, ভগবান বিষ্ণু)-এর প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।

    4. ॐ अनंताय नमः।
      বাংলা অর্থ: অনন্ত (যিনি অনন্তকাল পর্যন্ত বিরাজমান, ভগবান বিষ্ণু)-এর প্রতি প্রণাম।

    5. ॐ गोविंदाय नमः।
      বাংলা অর্থ: গোবিন্দ (যিনি পৃথিবীর রক্ষা করেন এবং সুখ প্রদান করেন)-এর প্রতি প্রণাম জানাই।

    এই মন্ত্রগুলো মোক্ষদা একাদশীতে ভগবান বিষ্ণুর পূজা এবং ধ্যানের সময় পাঠ করা হয়। মন্ত্রগুলি উচ্চারণের সাথে সাথে ভক্তের মধ্যে ভগবানের প্রতি গভীর ভক্তি ও শ্রদ্ধা প্রকাশ পায়।

    মোক্ষদা একাদশীর পারণের সময় সহ পূর্ণ বিবরণ

    মোক্ষদা একাদশী ব্রত ২০২৪ সালে বুধবার, ১১ই ডিসেম্বর পালিত হবে। একাদশী ব্রত শুরু হয় একাদশী তিথি থেকে এবং শেষ হয় দ্বাদশী তিথিতে পারণ করার মাধ্যমে।

    পারণের সময়

    পারণ করতে হবে দ্বাদশী তিথিতে, যা ১২ই ডিসেম্বর পড়ছে। দ্বাদশীতে সূর্যোদয়ের পর থেকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পারণ করা উচিত।

    • দ্বাদশীর সূচনা: ১২ই ডিসেম্বর সকাল ০৬:৫০ মিনিটে
    • পারণের সঠিক সময়:
      • সকাল ০৬:৫০ মিনিট থেকে দুপুর ০৯:০২ মিনিট পর্যন্ত।

    দ্রষ্টব্য: যদি কোনো কারণে এই সময়ের মধ্যে পারণ করা সম্ভব না হয়, তবে ব্রাহ্মণদের পরামর্শ অনুযায়ী দ্বাদশী তিথির মধ্যে যেকোনো শুভ মুহূর্তে পারণ করতে পারেন।


    পালনের সম্পূর্ণ পদ্ধতি (উপবাস থেকে পারণ পর্যন্ত)

    ১. ব্রতের শুরু: একাদশীর দিন

    ১. উপবাস:

    • একাদশীর দিন উপবাস করুন।
    • ফল, দুধ, পানি বা নিরামিষ খাবার গ্রহণ করতে পারেন (ফলাহার)।
    • তামসিক ও অনুচিত খাবার পরিহার করুন।

    ২. পূজা-অর্চনা:

    • সকালে স্নান সেরে শুদ্ধ বস্ত্র পরিধান করুন।
    • ভগবান বিষ্ণুর চরণে গঙ্গাজল, তুলসী পাতা, ফুল এবং ফল নিবেদন করুন।
    • বিষ্ণু সহস্রনাম বা ভগবদ্গীতা পাঠ করুন।

    ৩. জাগরণ:

    • একাদশীর রাতে ভগবান বিষ্ণুর নাম সংকীর্তন এবং ভক্তিমূলক গান গেয়ে জাগরণ করুন।

    ২. ব্রতের সমাপ্তি: দ্বাদশীর দিন (পারণ)

    ১. স্নান এবং পূজা:

    • ভোরবেলা স্নান সেরে ভগবান বিষ্ণুর পূজা করুন।
    • দান করার আগে নিজে কিছু গ্রহণ করবেন না।

    ২. দান:

    • ব্রাহ্মণ বা দরিদ্রদের দান করুন।
    • দান হিসেবে খাদ্য, বস্ত্র, অর্থ বা অন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী দেওয়া যেতে পারে।

    ৩. পারণ:

    • নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পারণ করুন।
    • প্রথমে ভগবান বিষ্ণুকে প্রণাম করে পারণ শুরু করুন।
    • ফল, দুধ, বা নিরামিষ খাদ্য গ্রহণ করে ব্রত সমাপ্ত করুন।

    উপসংহার

    মোক্ষদা একাদশী শুধুমাত্র উপবাসের একটি নিয়ম নয়, এটি আত্মার শুদ্ধি এবং মোক্ষ লাভের একটি পবিত্র পথ। সঠিক নিয়ম মেনে এই ব্রত পালন করলে পাপ মোচন এবং পিতৃ মুক্তি সম্ভব। পারণ সঠিক সময়ে করলে ব্রতের পূর্ণ ফল লাভ হয়।

    মোক্ষদা একাদশী পাপ মুক্তি ও আত্মার উন্নতির এক মহতী সুযোগ। এই তিথিতে সৎভাবে ভগবান বিষ্ণুর আরাধনা ও উপবাস পালন করলে পার্থিব জীবনে সুখ এবং মৃত্যুর পরে মোক্ষ লাভ সম্ভব হয়। এটি শুধু একটি ধর্মীয় প্রথা নয়, বরং আত্মা ও মনকে শুদ্ধ করার একটি উপায়।

    No comments:

    Post a Comment

    Post Bottom Ad

    Pages